আফগানিস্তানে সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় থাকা তালেবানকে স্বীকৃতি দেবে কিনা, তা নিয়ে বিশ্বের কোনো দেশেরই এখনও স্পষ্ট অবস্থান নেই। সর্বশেষ তালেবানবিরোধী জঙ্গিগোষ্ঠী ‘ইসলামিক স্টেট অব খোরাসান প্রভিন্স’ (আইএসকেপি) কাবুল বিমানবন্দরে রক্তক্ষয়ী হামলার দায় স্বীকারের পর দেশটিতে স্থিতিশীল সরকার গঠন নিয়ে বড় সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। দারিদ্র্যপীড়িত দেশটিতে আবার দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশও আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তালেবান সরকারের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক হবে, তা নিয়ে দায়িত্বশীল কেউ এখন কোনো মন্তব্যও করতে চাচ্ছেন না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, তালেবানকে স্বীকৃতি দেওয়া কিংবা না দেওয়ার বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। জি-৭ভুক্ত দেশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, চীন, রাশিয়ার মতো দেশগুলো কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়, তা আগে দেখা হবে। পাশাপাশি ওআইসির অবস্থানের বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনায় থাকবে বাংলাদেশের।

গত ২২ আগস্ট ওআইসির জরুরি বৈঠকে সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ড. জাবেদ পাটোয়ারী আফগানিস্তান সম্পর্কে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। বৈঠকে তিনি বলেন, বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করে এবং অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে আফগানিস্তানের জনগণের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উন্নয়ন এবং মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা উচিত। ওআইসির উচিত হবে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন নিশ্চিতকল্পে ওআইসি ও এর সদস্য দেশগুলোর করণীয় বিষয়ে বিবেচনার জন্য সুপারিশ করা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ বিশ্বাস করে, আফগানিস্তানের ভূমি অন্য দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকা পরিচালনার জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশকে আরও কিছুদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত তালেবানের উত্থানে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের বৈঠকে যে বক্তব্য দিয়েছে, সেই উদ্বেগ বাংলাদেশের জন্যও প্রযোজ্য।

যে বিষয়গুলোতে নজর :সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ বিশেষভাবে আফগানিস্তানের পরিস্থিতিতে নজর রাখছে। এর একটি দিক হচ্ছে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ পরিস্থিতির কী প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা। অন্যটি হচ্ছে- তালেবান উত্থানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা তালেবান সমর্থক গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানের প্রতি নজর রাখা। কারণ এর আগে ১৯৯৬ সালে তালেবান গোষ্ঠী আফগানিস্তানে ক্ষমতায় থাকার সময়ে বাংলাদেশে তাদের সমর্থক গোষ্ঠীর সহিংস কার্যক্রম দেখা গেছে। সে ধরনের কার্যক্রম যেন তারা নতুন করে চালাতে না পারে, সে জন্য কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার।

১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানের ক্ষমতা নেওয়ার পর ঢাকায় কোনো রাষ্ট্রদূত পাঠায়নি তালেবান। বাংলাদেশও কাবুলে দূতাবাস খোলার সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখলেও এখন পর্যন্ত তা খোলেনি। আপাতত ওআইসির বৈঠকে সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিই বাংলাদেশের অবস্থান।

অপর একটি সূত্র জানায়, যদি তালেবান সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি পায়, তাহলে বাংলাদেশ কাবুলের সঙ্গে কৌশলগত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। বাংলাদেশ আফগানিস্তানের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে সম্পর্ক বিস্তৃত করতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি না পেলে বাংলাদেশ পরিস্থিতি বিবেচনায় কাবুলের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন নির্ধারণ করতে পারে।

সাবেক একজন কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ মুহূর্তে ওআইসির পক্ষে আফগানিস্তানে তালেবানের সমর্থনের প্রশ্নে একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জটিলতা রয়েছে। যদিও সর্বশেষ জরুরি বৈঠক থেকে ওআইসি আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নেতাদের প্রতি শান্তি বজায় রাখা এবং আফগানিস্তান যেন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্র না হয়ে উঠতে পারে সে বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু তালেবান পূর্ণাঙ্গ সরকার গঠন করলে সেক্ষেত্রে তালেবান সরকারের প্রতি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কাই বেশি। কারণ ওআইসিভুক্ত দেশগুলোও কোনোটি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থক, কোনোটি চীন-রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখছে। আবার ওআইসিভুক্ত একাধিক দেশ আছে যাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। অতএব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আফগানিস্তানে তালেবান সরকার প্রশ্নে একটি ‘সাধারণ’ সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে ওআইসির পক্ষেও সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হবে।

বিশেষজ্ঞের বক্তব্য :সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালিউর রহমান সমকালকে বলেন, চট করে বাংলাদেশের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। আগে দেখতে হবে বাংলাদেশের জন্য আর্থিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো কী ধরনের ভূমিকা নেয়। সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য এখন পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জি-৭ভুক্ত দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের সারিতে চলে আসার পর বাংলাদেশকে ইইউ এবং জি-৭ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। অতএব ইইউ এবং জি-৭ রাষ্ট্রগুলোর স্পষ্ট অবস্থান শেষ পর্যন্ত কী হয়, তা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বেশি নজর রাখতে হবে পাকিস্তানের দিকে। বাংলাদেশে তালেবান সমর্থক হিসেবে পরিচিতরা সবাই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সৃষ্টি। ১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানের পর বাংলাদেশে যত জঙ্গি-সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে, তার সবক’টির পেছনে ছিল আইএসআই।