1. jakariaalfaj@gmail.com : admin2020 :
শনিবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২১, ০৯:০৮ অপরাহ্ন

খেলাঘর ভাঙতে চলেছে

টেকনাফ ভয়েস ডেস্ক ::
  • আপডেট টাইম :: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২০
  • ৩৩ বার পড়া হয়েছে

এতক্ষণে খবরটা বাসি। বিশ্ব ফুটবল জেনে গেছে, সরে যেতে চেয়েছেন বার্সেলোনার নক্ষত্রপুঞ্জের শশী লিওনেল মেসি। গ্রহণ লেগেছে মেসি-বার্সার অবিচ্ছেদ্য পৃথিবীতে। প্রিয়ার সঙ্গে ছিন্ন করতে চেয়েছেন তার কুড়ি বছরের একটু একটু করে জমানো আত্মার পবিত্র সম্পর্কটি। লাল-মেরুনের জামা গায়ে মেসি আর হয়তো পারিজাতের গন্ধ ছড়াবেন না ন্যু ক্যাম্পে। সমুদ্রের ঢেউ আনবেন না আর কাতালান ক্লাববাড়িটির হয়ে। কাতালোনিয়াদের জন্য, রাত জেগে অপেক্ষা করা কিশোর-কিশোরীদের জন্য, বৃদ্ধার হাত ধরে দাঁড়ানো বৃদ্ধের জন্য, হারিয়ে যাওয়া বার্সাপ্রেমীদের জন্য এ বড় কষ্টের দিন। নিষ্ঠুর বিচ্ছেদের দিন। মেসি ছাড়া বার্সা- তাও কি কখনও সম্ভব? গেল চব্বিশ ঘণ্টার ফুটবল পৃথিবী বুঝে নিয়েছে- সব সম্পর্কই অমর থাকে না।

১৪ ডিসেম্বর ২০০০ ন্যাপকিনের ছেঁড়া কাগজে যে আত্মীয়তা শুরু হয়েছিল কুড়ি বছর আগে; ২৫ আগস্ট ২০২০ এসে তার সমাপ্তি কিনা ছোট বাক্যের একটি ব্যুরোফ্যাক্সবার্তায়। আর্জেন্টিনার রোজারিও থেকে বাবার সঙ্গে ঝাঁকড়া চুলের লাজুক যে কিশোর একদিন পা রেখেছিল স্পেনে। তখন তো তার কাছে অচেনা জগৎই ছিল এই বার্সেলোনা। লা মাসিয়া একাডেমির হোস্টেল জীবনে রাতে মায়ের জন্য কেঁদে ওঠা, বিদেশি কিশোরের কাগজ জটিলতায় প্রথম বছর খেলতে না পারা- সব কাটিয়ে সেই কিশোরই তো এই ক্লাবকে একদিন প্রচণ্ড ভালোবেসে ফেলেন।

১৬টি মৌসুম কাটিয়ে দেন এই ক্লাবের ভালো-মন্দে। শুধুই কি পেশাদারিত্বের কারণে? শুধুই কি অর্থ আর সুযোগ-সুবিধার কারণে। স্প্যানিশ দৈনিক মার্কার সম্পাদক জোয়ান গ্যালার্দো তার একটি লেখায় লিখেছেন, মেসি আর বার্সার সম্পর্ক কখনোই শুধু টাকাপয়সা দিয়ে নির্ণয় করা যাবে না। যদি নিষ্পাপ ভালোবাসা না থাকত, যদি আবেগের তীব্রতা না থাকত, যদি দু’পক্ষের শ্রদ্ধার জায়গা না থাকত তাহলে বার্সা আর মেসির সম্পর্ক পবিত্রতা পেত না। বার্সেলোনার সঙ্গে মেসির- খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি- সেই কিশোর প্রেম থেকেই, যা কুড়িতে এসে ভাঙতে চলেছে।

ছোট বাক্যের একটি ফ্যাক্সবার্তা- ‘কুয়েরো ইরমি ডেল বার্সেলোনা এফসি’। স্প্যানিশের বঙ্গানুবাদে, ‘আমি বার্সেলোনা ছাড়তে চাই।’ মাঝরাতে বিশ্ব ফুটবলে কম্পন ধরানোর জন্য এটুকুই ছিল যথেষ্ট। রিখটার স্কেল ধরে এর মাত্রা হয়তো মাপা সম্ভব নয়, তবে যে মুহূর্তে মেসির সঙ্গে বার্সেলোনার ‘আছি’ থেকে ‘ছিলাম’ সম্পর্ক রটে গেছে, তখন থেকেই বার্সেলোনার স্টক এক্সচেঞ্জে লা লিগার স্পন্সর ‘বিবিভিএ’র শেয়ার দরে পতন ধরেছে। বার্সার স্পন্সর রাকুটিনের বিশ্ববাজারে দর পড়েছে। ইউরোপের অনলাইন বাজিকর সংস্থায় মেসির পরবর্তী ঠিকানা নিয়ে দর ওঠানামা করছে।

আপাতত ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার সিটিতে যাওয়ার সম্ভাবনার ওপর বাজির দর বেশি রয়েছে। লন্ডনের ট্যাবলয়েড ডেইলি মেইলের এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট- দিন তিনেক আগেই ম্যানসিটির কাতালোনিয়ান কোচ পেপ গার্দিওলার সঙ্গে কথা হয়েছে মেসির। সেখানে শুধু তার সাবেক প্রিয় কোচই নন, রয়েছেন তার বাল্যবন্ধু আগুয়েরোও। তাই পরবর্তী ঠিকানা সেখানে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

ওদিকে আবার খবর রটেছে, নেইমারদের ফরাসি ক্লাব পিএসজিও নাকি দু’হাত বাড়িয়ে রেখেছে এমএলটেনের জন্য। এখানে নাকি নেইমার প্রস্তাব দিয়েছেন, সঙ্গে সুয়ারেজকেও নিয়ে আসতে পারবেন মেসি। প্রস্তাবটি তার জন্য আকর্ষণীয় এ কারণেই। ওদিকে ইতালি থেকেও ডাক দিয়ে রেখেছে ইন্টার মিলান। ওখানকার খবর, মিলানে নাকি মেসির বাবা একটি বাড়িও কিনে রেখেছেন। আসলে আম-আর্জেন্টাইনদের কাছে ইউরোপের ইতালি বেশ আপনজনের মতো। অনেকেরই আত্মীয় ও বাড়িঘর কেনা থাকে সেখানে। তবে মেসির পরবর্তী ‘কেয়ার অফ’ কোথায়, তা এখনও কেউ নিশ্চিত করতে পারেননি।

তবে এটা নিশ্চিত হয়ে গেছে, আর যা-ই হোক, বার্সেলোনার বাংলোতে আর থাকছেন না মেসি-রোকুজ্জ। সেখানকার বাড়ি ছাড়ছেনই তিনি। বার্সার সঙ্গে মেসির চুক্তি রয়েছে ২০২০-২১ মৌসুম পর্যন্ত। অর্থাৎ আরও এক বছর থাকার কথা ছিল তার এখানে। কিন্তু চুক্তিতে দল ছাড়ার একটি শর্ত ছিল এমন, কোনো মৌসুম শেষে মেসি চাইলে বার্সা ছাড়তে পারবে। চলতি বছরের মে মাসে বর্তমান মৌসুম শেষ হওয়ার সময় ১০ জুন পর্যন্ত দল ছাড়ার কথা জানানোর শেষ সময় ছিল। কিন্তু মেসির আইনজীবী জানিয়েছেন, করোনার কারণে বর্তমান মৌসুম শেষ হয়েছে আগস্টে। তাই ওই শর্ত খাটবে না। শর্ত ভঙ্গ করে বার্সা ছেড়ে অন্য দলে যাওয়ার জন্য ওই ক্লাবকে ৭০ কোটি ইউরো দিতে হবে বার্সাকে। দু’পক্ষের সম্মতিতে সম্পর্কচ্ছেদ হলে হয়তো আদালতে বিষয়টি গড়াবে না। বার্সা কর্তৃপক্ষও চাইছে না মেসিকে চটাতে। হয়তো ‘ঘরের ছেলে’র জন্য ভবিষ্যতের একটি রাস্তা খোলা রাখতে চাইছে তারা। এমনিতেই বায়ার্নের কাছে আট গোলে হারার পর নতুন কোচ রোনাল্ড কোম্যান দলকে দাবার বোর্ডের মতো ঢেলে সাজাতে চাইছেন। আর তা থেকেই নাকি আজকের এই পরিণতি।

আর্জেন্টাইন টিওয়াইসি স্পোর্টস, যার সঙ্গে মেসির খুব ভালো সম্পর্ক, সেই মিডিয়ার খবর- ক’দিন আগে রোনাল্ড কোম্যানের একটি মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়েছিল। সেখানে মেসিকে বার্সার নতুন কোচ বলেন, ‘আমার দলে তুমি কিন্তু আর বাড়তি সুবিধা পাবে না। তোমাকে অত গুরুত্ব দেওয়া হবে না।’ ব্যস, ওই কথার পরই নাকি মেসির কুড়ি বছরের লালিত বিশ্বাস আর ভালোবাসায় আঘাত লাগে। পরিবারের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করে নেন- আর না বার্সেলোনায়। রাগ? তার তো প্রকাশ থাকে তীব্রতা আর হিংসায়। এটা আসলে রাগ নয়, এটা ছিল মেসিকে উপেক্ষা। যার মধ্যে প্রকাশের তীব্রতা থাকে না, কিন্তু প্রতিক্রিয়া থাকে ভয়ংকর।

বার্সাকে কী দিয়েছেন মেসি, কটা গোল করেছেন তিনি, তার মিডফিল্ডার থেকে ফরোয়ার্ডে বিবর্তন সংজ্ঞা কী- সেসব আলোচনার আজ মানে নেই। ওগুলো থাকুক ফুটবল ইতিহাসের কাছে। ওই ইতিহাসই মেসির এসব ঐশ্বরিক সম্পদ বুকের মধ্যে রেখে দেবে। অনেকে যারা মেসিকে চোখের সামনে দেখেননি, কিন্তু না দেখেও বুকের গভীরে হৎপিণ্ড বা ফুসফুসের মতোই চিরন্তন হয়ে উঠেছেন গভীর রাতে বার্সেলোনার ম্যাচ দেখার সৌজন্যে। মেসির জন্য বার্সেলোনাই হয়ে উঠেছে তাদের কাছে স্বর্গ, ন্যু ক্যাম্প হয়ে গেছে তাদের কাছে তীর্থ। তাদের নতুন করে মনের গভীরে খেলাঘর বাঁধতে লাগতে হবে। মেসির সঙ্গে হয়তো নতুন কোনো ক্লাবে, নতুন কোনো তীর্থে।
কেন ছাড়তে চান?

বর্তমান ও পূর্বের নানা ঘটনাপরম্পরায় কিছু কারণ স্পষ্ট। এর মধ্যে সর্বশেষটি হচ্ছে নতুন কোচ রোনাল্ড কোম্যানের কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা। আগামী দিনে দল কীভাবে চলবে- এমন ধারণা দিতে গিয়ে প্রকারান্তরে মেসিকে বদলানোর নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া আছে বার্তামেউয়ের নেতৃত্বাধীন বোর্ডের কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্টি এবং মাঠের ফুটবলের দুরবস্থা।
বার্সা কি আটকাতে পারবে?

চুক্তি অনুযায়ী ৩০ জুনের আগের ২০ দিনের মধ্যে দল ছাড়া যাবে। বার্সেলোনার দাবি, সে সময় পার হয়ে যাওয়ায় চুক্তি এখন কার্যকর অবস্থায় আছে। বিপরীত মত হচ্ছে, করোনার কারণে এবার মৌসুম শেষ হয়েছে আগস্টে। পরিবর্তিত এ পরিস্থিতিতে মৌসুমের শেষ ম্যাচের পরের ১০ দিন পর্যন্ত মৌসুমকেন্দ্রিক সবকিছু চলমান থাকবে। দু’পক্ষ নিজের জায়গায় অনড় থাকলে মীমাংসার জন্য যেতে হতে পারে আদালতে।

যাবেন কোথায়?

ঘুরেফিরে নাম আসছে ইংল্যান্ডের ম্যানসিটি, ফ্রান্সের পিএসজি আর ইতালির ইন্টার মিলানের। তিনটি ক্লাবই আর্থিকভাবে শক্তিশালী। ম্যানসিটিতে আছেন মেসির সাবেক কোচ পেপ গার্দিওলা ও আর্জেন্টাইন সতীর্থ সার্জিও অ্যাগুয়েরো। ক’দিন আগে পিএসজি কোচ বলেছেন, মেসির মতো খেলোয়াড় কে না চায়। ওদিকে মেসিকে কিনতে ২৬০ মিলিয়ন ইউরো নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছে ইন্টার মিলান।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2019 teknafvoice
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com